মেষপালক
রঙরেখা

যোগেন চৌধুরীর শিল্পভাষা: রেখা, শরীর ও মানুষের অন্তর্লোক

সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণার বাইরে: যোগেন চৌধুরীর শিল্পে মানবদেহের পুনর্নির্মাণ।

গৌতম রায়

১০ মিনিটে পড়া

যোগেন চৌধুরীর শিল্পভাষা: রেখা, শরীর ও মানুষের অন্তর্লোক
যোগেন চৌধুরী (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯ – ২৫ অক্টোবর ২০২৬)

ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসে যোগেন চৌধুরী এমন এক শিল্পী, যার শিল্পভাষা একই সঙ্গে স্বতন্ত্র, গভীরভাবে ভারতীয় এবং সমকালীন জীবনচেতনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। তার ছবির দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে রেখার অসামান্য ব্যবহার, মানুষের শরীরের বিশেষ ধরনের গঠন, মুখাবয়বের অদ্ভুত অভিব্যক্তি, রং ও রেখার পারস্পরিক সংঘাত এবং বাস্তব জীবনের অন্তর্লীন অস্বস্তিকে শিল্পে রূপান্তরিত করার ক্ষমতা।

কিন্তু যোগেন চৌধুরীর শিল্পকে কেবল রেখার কুশলতা কিংবা মানুষের শরীর আঁকার অভিনব পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তার সৃষ্টির প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তার শিল্পের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ—তার শরীর, তার একাকিত্ব, তার সামাজিক অবস্থান, তার কামনা, তার দুর্বলতা, তার আত্মমর্যাদা এবং তার অস্তিত্বের নানা সংকট।

যোগেন চৌধুরী এমন এক সময়ের শিল্পী, যখন ভারতীয় চিত্রকলাকে একদিকে ঔপনিবেশিক শিল্পশিক্ষার উত্তরাধিকার, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পঐতিহ্যের পুনর্মূল্যায়ন এবং তৃতীয়দিকে আন্তর্জাতিক আধুনিকতাবাদের নানা প্রবণতার সঙ্গে সংলাপ স্থাপন করতে হয়েছে। এই তিনটি ধারার কোনও একটির মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ আবদ্ধ না রেখে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব শিল্পভাষা। তার ছবিতে পাশ্চাত্য আধুনিকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে, কিন্তু তা অনুকরণনির্ভর নয়; ভারতীয় লোকশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী চিত্ররীতির প্রভাব রয়েছে, কিন্তু তা অতীতের পুনরাবৃত্তি নয়। বরং বিভিন্ন শিল্প-অভিজ্ঞতাকে আত্মস্থ করে তিনি এমন এক চিত্রভুবন নির্মাণ করেছেন, যেখানে আধুনিক মানুষের জীবনবোধ এবং ভারতীয় সমাজের বাস্তবতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে।

১৯৩৯ সালে অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে জন্মগ্রহণকারী যোগেন চৌধুরীর জীবন ও শিল্পচর্চার সঙ্গে দেশভাগের অভিজ্ঞতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। দেশভাগের ফলে পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসা মানুষের অনিশ্চয়তা, স্থানচ্যুতি এবং পরিচয়ের সংকট তার প্রজন্মের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার অংশ।

যদিও কোনও শিল্পকর্মকে কেবল শিল্পীর জীবনের কোনও একটি ঘটনার সরল প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়, তবু তার শিল্পের মানুষের শরীরী অস্বস্তি, অন্তর্গত উদ্বেগ এবং সামাজিক বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীলতা বুঝতে এই বৃহত্তর ঐতিহাসিক পটভূমি তাৎপর্যপূর্ণ।

যোগেন চৌধুরীর শিল্পের বিশেষত্ব এই যে, তিনি মানুষকে আদর্শায়িত করেন না। মানুষের শরীরকে নিখুঁত সৌন্দর্যের প্রচলিত মানদণ্ডে সাজিয়ে তোলেন না। তার মানুষ কখনও ক্লান্ত, কখনও আত্মমগ্ন, কখনও অস্বস্তিকরভাবে বাস্তব, কখনও বিদ্রুপাত্মক, কখনও আবার গভীর বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন। এই মানুষ আমাদের পরিচিত সমাজেরই মানুষ, অথচ শিল্পীর হাতে তারা দৈনন্দিন পরিচিতির সীমা অতিক্রম করে মানব-অস্তিত্বের বৃহত্তর প্রশ্নের প্রতীক হয়ে ওঠে।

রেখার স্বাতন্ত্র্য: যোগেন চৌধুরীর শিল্পভাষার প্রধান ভিত্তি

যোগেন চৌধুরীর শিল্পকর্মের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য তার রেখার ব্যবহার। ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলায় রেখার গুরুত্ব নতুন নয়। ভারতীয় ক্ষুদ্রচিত্র, পটচিত্র, কালিঘাটের ছবি, লোকশিল্প এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক চিত্ররীতিতে রেখা দীর্ঘকাল ধরে আকার, আবেগ ও কাহিনি প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু যোগেন চৌধুরী এই ঐতিহ্যকে এমনভাবে রূপান্তরিত করেছেন, যাতে রেখা আর কেবল বস্তুর বাইরের সীমানা নির্ধারণ করে না; রেখা হয়ে ওঠে চরিত্রের মনস্তত্ত্ব, শরীরের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন এবং সামাজিক অবস্থানের প্রকাশমাধ্যম।

তার ছবিতে রেখা কখনও সরু, কখনও মোটা, কখনও ঘন, কখনও পরস্পরকে ছেদ করে তৈরি করে জটিল বুনন। কখনও রেখার প্রবাহ মসৃণ ও বাঁকানো, আবার কখনও সেই প্রবাহের মধ্যে এমন এক অস্বস্তিকর টান থাকে, যা দর্শককে ছবির মানুষের মানসিক অবস্থার দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য করে। এই রেখাগুলি শরীরকে শুধু ঘিরে রাখে না, শরীরের মধ্যে যেন এক ধরনের স্পন্দন সৃষ্টি করে।

যোগেন চৌধুরীর রেখা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, তা একই সঙ্গে নির্মাণ ও ভাঙনের কাজ করে। রেখা শরীরকে গঠন করে, আবার সেই শরীরের প্রচলিত সৌন্দর্যবোধকেও ভেঙে দেয়। মানুষের মুখ, হাত, পা, উদর কিংবা পিঠের বাঁক তার ছবিতে স্বাভাবিক শারীরিক গঠনের অনুকরণমাত্র নয়। এগুলি শিল্পীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে পুনর্নির্মিত। ফলে ছবির মানুষকে দেখে বাস্তব মানুষের কথা মনে পড়ে, অথচ তাকে সরাসরি বাস্তবের অনুলিপি বলে মনে হয় না।

এই রেখাভাষার মধ্যেই যোগেন চৌধুরীর শিল্পীসত্তার মৌলিকতা নিহিত। তার রেখা অলংকার তৈরি করে, কিন্তু নিছক অলংকার হয়ে থাকে না। তার মধ্যে আবেগ আছে, ব্যঙ্গ আছে, অস্বস্তি আছে, কখনও বিষণ্নতা, কখনও কামনা, কখনও ক্ষমতার প্রতি সংশয়। রেখার এই বহুমাত্রিক ব্যবহার তাকে ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম বিশিষ্ট শিল্পী করে তুলেছে।

ক্রস-হ্যাচিং: রেখার মধ্য দিয়ে শরীরের মনস্তত্ত্ব

যোগেন চৌধুরীর শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গেলে তার ক্রস-হ্যাচিং বা পরস্পরকে ছেদ করা সূক্ষ্ম রেখার বুনন বিশেষ গুরুত্ব পায়। এই পদ্ধতিতে রেখার উপর রেখা বসিয়ে তৈরি হয় আলো-ছায়ার বৈচিত্র্য, শরীরের ঘনত্ব, ত্বকের স্পর্শযোগ্যতা এবং আকৃতির গভীরতা। তার হাতে এই পদ্ধতি নিছক কারিগরি কৌশল হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে মানসিক ভাষা।

প্রচলিত বাস্তববাদী চিত্রকলায় শরীরের ত্রিমাত্রিকতা বোঝাতে আলো, ছায়া ও রঙের বিভিন্ন স্তর ব্যবহার করা হয়। যোগেন চৌধুরীও আলো-ছায়ার অনুভূতি সৃষ্টি করেন, কিন্তু তার ছবিতে সূক্ষ্ম রেখার ঘন জাল প্রায়শই শরীরের স্বাভাবিক মসৃণতাকে ভেঙে দেয়। ফলে মানবদেহে অস্বাভাবিক ঘনত্ব এবং অন্তর্গত উত্তেজনা তৈরি হয়।

তার ছবির কোনও কোনও শরীরের উপর এই রেখাবিন্যাস দেখে মনে হতে পারে, ত্বকের নীচে শিরা-উপশিরার জাল ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও তা শরীরের ভাঁজকে প্রকট করে, কোথাও মাংসলতার অনুভূতি বাড়ায়, কোথাও আবার শরীরের উপর চাপা পড়ে থাকা মানসিক অস্থিরতাকে দৃশ্যমান করে। বাস্তব শরীরের জৈবিক উপস্থিতি এবং মানুষের অন্তর্গত উদ্বেগ এই রেখাবিন্যাসে একাকার হয়ে যায়।

এখানে একটি গভীর নন্দনতাত্ত্বিক প্রশ্ন রয়েছে। শরীর কি কেবল সুন্দরভাবে দেখানোর বস্তু, নাকি শরীরের মধ্যেই মানুষের সামাজিক অভিজ্ঞতা, মানসিক দ্বন্দ্ব এবং অস্তিত্বের ইতিহাস জমা থাকে? যোগেন চৌধুরীর শিল্প দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিকে সামনে নিয়ে আসে। তার মানুষকে নিখুঁত ও মসৃণ করে তোলার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। বরং শরীরের অস্বস্তিকর দিকগুলি প্রকাশের মধ্য দিয়েই তিনি মানবজীবনের জটিল সত্যের কাছে পৌঁছতে চান।

ক্রস-হ্যাচিংয়ের এই স্বতন্ত্র ব্যবহার তার ছবিকে সহজে শনাক্তযোগ্য করে তোলে। কিন্তু এর গুরুত্ব শুধু পরিচিত শৈলী তৈরিতে নয়। রেখার পুনরাবৃত্তি, ঘনত্ব ও বিন্যাসের মাধ্যমে তিনি শরীরের উপর সময়ের চাপ, আবেগের ভার এবং অস্তিত্বের অনিশ্চয়তার অনুভূতি তৈরি করেন।

gautam roy 26 02
যোগেন চৌধুরীর কিছু শিল্পকর্ম

মানবদেহের পুনর্নির্মাণ: সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে

যোগেন চৌধুরীর ছবির মানুষদের দেখলে বোঝা যায়, তিনি মানবদেহকে প্রচলিত সৌন্দর্যবোধের ছাঁচে ফেলতে চান না। তার ছবিতে পুরুষ ও নারী কখনও মাংসল, কখনও ভারী, কখনও অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত, কখনও সংকুচিত, কখনও এমন ভঙ্গিতে উপস্থিত যে দর্শকের মধ্যে একই সঙ্গে কৌতূহল ও অস্বস্তি সৃষ্টি হয়।

পাশ্চাত্য ধ্রুপদী শিল্পের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যে মানবদেহকে আদর্শ অনুপাত, ভারসাম্য ও শারীরিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। ভারতীয় শিল্পেও দেবদেবী ও আদর্শ মানবমূর্তির নানা নন্দনতাত্ত্বিক রীতি রয়েছে। যোগেন চৌধুরী এই ঐতিহ্যগুলিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন না; বরং মানুষের শরীরকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করেন।

তার ছবির দেহ যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নয়। মানুষ ক্লান্ত হয়, তার শরীরের ভাঁজ পড়ে, সে সামাজিক মর্যাদার ভার বহন করে, সে আকাঙ্ক্ষা ও হতাশার মধ্যে বেঁচে থাকে। মানুষের এই অসম্পূর্ণতাই তার বাস্তব অস্তিত্বের অংশ।

তার ছবির শরীরের বিকৃতি তাই অদক্ষ অঙ্কনের ফল নয়। এটি সচেতন শৈল্পিক সিদ্ধান্ত। কোনও চরিত্রের শরীরের অনুপাত বদলে দিয়ে শিল্পী তার সামাজিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যকে তীব্র করে তুলতে পারেন। মুখের অভিব্যক্তি, দেহের ভঙ্গি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিন্যাস তখন চরিত্রের অন্তর্লোকের ইঙ্গিত দেয়।

এই প্রসঙ্গে ব্যঙ্গচিত্রের সঙ্গে তার শিল্পের একটি সম্পর্ক লক্ষ করা যায়। ব্যঙ্গচিত্রে যেমন কোনও বৈশিষ্ট্যকে অতিরঞ্জিত করে চরিত্রের প্রকৃতি প্রকাশ করা হয়, যোগেন চৌধুরীও কখনও শরীরের বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে বাড়িয়ে তোলেন। তবে তার ছবি নিছক হাস্যরস সৃষ্টির জন্য নয়। এই অতিরঞ্জনের মধ্যে প্রায়শই থাকে সামাজিক বিদ্রুপ, মানসিক দ্ব্যর্থতা এবং ক্ষমতার সম্পর্ক সম্পর্কে প্রশ্ন। তার শিল্পে শরীরের এই পুনর্নির্মাণ দর্শককে শেখায় যে, সৌন্দর্য মানেই নিখুঁত অনুপাত নয়। কখনও অস্বাভাবিকতাই মানুষের গভীরতর সত্যকে প্রকাশ করতে পারে।

মুখাবয়ব ও অভিব্যক্তি: মানুষের অন্তর্লোকের অনুসন্ধান

যোগেন চৌধুরীর ছবিতে মুখ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু তার মুখগুলি সব সময় প্রচলিত অর্থে স্পষ্ট আবেগ প্রকাশ করে না। কোনও মুখে আত্মমগ্নতা, কোনও মুখে নির্লিপ্ততা, কোনও মুখে সংশয়, কোনও মুখে এমন এক অস্পষ্ট অভিব্যক্তি দেখা যায়, যার অর্থ নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।

এই অস্পষ্টতাই তার শিল্পের একটি শক্তি। বাস্তব জীবনে মানুষের অনুভূতি সব সময় সরল ও সুস্পষ্ট হয় না। একজন মানুষ একই সঙ্গে আত্মবিশ্বাসী এবং অনিশ্চিত হতে পারেন; সামাজিকভাবে ক্ষমতাবান হয়েও অন্তর্গতভাবে দুর্বল থাকতে পারেন; বাহ্যিকভাবে নির্লিপ্ত দেখালেও তার মধ্যে জমে থাকতে পারে গভীর অস্থিরতা। যোগেন চৌধুরীর মুখাবয়বের নির্মাণে এই জটিলতার উপস্থিতি অনুভব করা যায়।

তার ছবির চোখ, ঠোঁট, মুখের বাঁক এবং মাথার অবস্থান কখনও চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার ইঙ্গিত দেয়, আবার কখনও সেই অবস্থাকে আরও রহস্যময় করে তোলে। দর্শককে তাই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে শুধু মানুষটিকে দেখতে হয় না, তার সম্পর্কে ভাবতেও হয়। এই বৈশিষ্ট্য তার শিল্পকে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা দেয়। ছবির চরিত্রগুলি কোনও নির্দিষ্ট কাহিনির অধীন পুতুল নয়। তারা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে উপস্থিত। তাদের অভিব্যক্তি ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু ব্যাখ্যার একমাত্র পথ নির্ধারণ করে দেয় না।

শিল্পের এই উন্মুক্ততা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দর্শক ছবির মধ্যে নিজের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও সামাজিক উপলব্ধির প্রতিফলন খুঁজে পেতে পারেন। একই ছবি এক দর্শকের কাছে বিদ্রুপাত্মক, অন্য দর্শকের কাছে বিষণ্ন, আবার তৃতীয় দর্শকের কাছে ক্ষমতা ও দুর্বলতার সম্পর্কের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

দেশীয় শিল্পঐতিহ্য ও আধুনিকতার সৃজনশীল সমন্বয়

যোগেন চৌধুরীর শিল্পের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো দেশীয় শিল্পঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক শিল্পভাবনার সংলাপ। তিনি কলকাতার সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেন এবং পরে ফ্রান্সের প্যারিসে উচ্চতর শিল্পশিক্ষার সুযোগ পান। ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যে তার ইউরোপীয় শিল্পশিক্ষার অভিজ্ঞতা তার শিল্পীজীবনে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তবে বিদেশে শিক্ষালাভের অর্থ তার শিল্পে পাশ্চাত্য রীতির অনুকরণ নয়। বরং বিভিন্ন শিল্পধারার সঙ্গে পরিচয়ের ফলে নিজের সাংস্কৃতিক অবস্থানকে নতুনভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। আধুনিক শিল্পের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা আত্মস্থ করেও তিনি ভারতীয় ও বিশেষত বাঙালি শিল্পঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।

কালিঘাটের পটচিত্রের সরল অথচ তীক্ষ্ণ রেখা, লোকশিল্পের অলংকারধর্মিতা এবং মানুষের চরিত্রকে বিশেষ ভঙ্গিতে প্রকাশ করার ক্ষমতার সঙ্গে তার শিল্পের কিছু নন্দনতাত্ত্বিক সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। একইসঙ্গে তার ছবির মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও শরীরের বিকৃত গঠন আধুনিক অভিব্যক্তিবাদী শিল্পভাবনার সঙ্গে সংলাপ স্থাপন করে।

এই দুই প্রবণতার সমন্বয় তাকে স্বতন্ত্র করেছে। তিনি ঐতিহ্যকে জাদুঘরে সংরক্ষিত কোনও স্থির সম্পদ হিসেবে দেখেন না। ঐতিহ্য তার কাছে এমন একটি জীবন্ত উপাদান, যা সমকালীন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নতুন অর্থ অর্জন করতে পারে। এখানে তার শিল্পের বাঙালিয়ানাও গুরুত্বপূর্ণ। এই বাঙালিয়ানা কেবল বাংলা ভাষা, ভূগোল কিংবা পরিচিত সাংস্কৃতিক প্রতীকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের শরীর ও আচরণ পর্যবেক্ষণের একটি পদ্ধতি, সামাজিক সম্পর্কের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং দৈনন্দিন জীবনের অন্তর্লীন নাটকীয়তাকে উপলব্ধি করার ক্ষমতার মধ্যেও প্রকাশিত।

তাই যোগেন চৌধুরীর শিল্প একই সঙ্গে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক। তার শিকড় নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় প্রোথিত, কিন্তু তার প্রশ্নগুলি বৃহত্তর মানবসমাজেরও প্রশ্ন।

ধরন ও বিষয়:
  • যোগেন চৌধুরী
  • চিত্রকলা
  • শিল্পকলা
  • চিত্রশিল্পী
  • আধুনিক চিত্রকলা
  • শিল্পী
  • শিল্পকর্ম
  • নন্দনতত্ত্ব
  • ভারতীয় শিল্পকলা
  • বাঙালি চিত্রশিল্পী

লেখাটি কেমন লাগল?

  • ০টি ভালোবাসা
  • এখনও কোনো রেটিং নেই

গৌতম রায়

লেখক

গৌতম রায়

প্রাবন্ধিক

মন্তব্য

মন্তব্য লোড হচ্ছে…