মেষপালক
অ্যাকাডেমিয়া

কবিতা আর গদ্যের তফাৎ: জন্ম ও রূপান্তর

গাছের ডালে এক জোড়া ক্রৌঞ্চ বা বক মিথুন খেলায় মত্ত। বাল্মীকি তাদের নাম দিলেন ‘কলকণ্ঠ ক্রৌঞ্চ’।

আলী আফজাল খান

১৩ মিনিটে পড়া

কবিতা আর গদ্যের তফাৎ: জন্ম ও রূপান্তর

শুরুটা করা যাক একদম গোড়া থেকে। যখন লেখার ভাষার জন্মই হয়নি, তখন কবিতা, গান বা গদ্য বলে আলাদা কোনো গণ্ডি ছিল না। মানুষের সম্বল ছিল কেবল ‘শ্রুতি’ বা মুখে মুখে শোনা কথা। বাল্মীকির আগে কোনো শ্লোক ছিল না; বেদ বা উপনিষদে ছিল কেবল মন্ত্র। সেগুলোকে গদ্য বা কবিতা কোনোটারই ছাঁচে ফেলা যায় না, তবে সেগুলোর মধ্যে এক ধরনের ছন্দ বা লয় ছিল। যেমন—“অসতো মা সদগময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ, মৃত্যুর্মা অমৃতমগময়ঃ।” এখানে শেষের ‘গময়ঃ’ শব্দটির পুনরাবৃত্তি কোনো অন্তমিল তৈরির জন্য নয়, বরং মন্ত্রটি সহজে মনে রাখার কৌশল মাত্র।

কালানুক্রমের দিক থেকে মহাভারত রামায়ণের পরের ঘটনা হলেও, ভাষা ও রচনার বৈশিষ্ট্য বিচার করলে দেখা যায় মহাভারত রামায়ণের প্রায় দু’হাজার বছর আগে রচিত। সে কারণেই মহাভারতে কোনো শ্লোক পাওয়া যায় না। সেখানে রয়েছে একের পর এক ঘটনার বিবরণ, চরিত্রদের কাজকর্ম এবং যুদ্ধের লাইভ বা চলমান বর্ণনা। সেগুলোতে ছন্দ থাকার কোনো সুযোগ বা বালাই ছিল না।

তবে বেদ-উপনিষদের জগৎ থেকে মহাভারতের ভাষা সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেল। বেদ-উপনিষদে যা ছিল মূলত গভীর ভাবনা বা ধারণার প্রকাশ, একটি কি দুটি সরল ঘটনাকে কেন্দ্র করে যার নানা দিক খুলে যেত। যেমন, নচিকেতাকে তার বাবা যমের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন, এই একটামাত্র সরল ঘটনা থেকে তৈরি হয়ে গেল আস্ত এক ‘কঠোপনিষদ’। সেখানে কথোপকথন বা সংলাপের মতো ব্যাপার থাকলেও তার মূল সুরটি ছিল মন্ত্রের মতো, কারণ তখন তো আর নোট লেখার খাতা ছিল না, সবটাই মনে রাখতে হতো।

মহাভারতের যুগে এসে আমরা দেখি লেখার ভাষার জন্ম হয়ে গেছে। কিন্তু সেকাল তো অতি প্রাচীন, তাই তখন সবাই লিখতে পারত না। আর লিখলেও গুছিয়ে ভাবার ও লেখার দক্ষতা তখনও কারও তৈরি হয়নি। ফলে দরকার পড়েছিল স্বয়ং লিপিকার গণেশের। নিজেকে যদি সেই প্রাচীন যুগে টেলিপোর্ট করেন, তবে দেখতে পাবেন চারদিকে হাজার হাজার কিলবিল করা শব্দ, বাক্য আর বাক্যাংশ ছড়িয়ে আছে।

কানে শুনলে যা কেবল একটা ছোট্ট মন্ত্রের মতো মনে রাখা যায়, লেখার বেলায় তার জন্য হাজারটা অক্ষর, শব্দ আর বিভক্তি আলাদা আলাদা করে মনে রাখতে হয়। ভাবুন তো কী বিপত্তি! ঠিক যেন প্রথম যুগের কোনো অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনের মতো দশা। ফোন করা, ধরা বা কাটার মতো সাধারণ কাজের মাঝে যখন হাজারটা অ্যাপ আর ঝামেলা এসে হাজির হয়, তখন যেমন মাথার চুল ছেঁড়ার উপক্রম হয়, মহাভারতের ভাষার অবস্থাও ঠিক তেমনি দাঁড়িয়েছিল।

এই জটিলতা থেকে ভাষাকে একটু গুছিয়ে চলার উপযোগী করে তোলার মাধ্যমেই জন্ম হলো গদ্যের। লেখা যেহেতু স্থায়ী হচ্ছে, তাই আর মন্ত্রের মতো সবকিছু মুখস্থ রাখার কোনো তাগিদ নেই। বরং এত সব ছড়িয়ে থাকা জিনিসপত্র গুছিয়ে মানুষের সামনে হাজির করার জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ল ভাষার এক অপারেটিং সিস্টেমের—যাকে আমরা বলতে পারি ‘গদ্য’ বা ‘গদ্যাকৃতি’। গদ্য পাওয়ার পরই আমরা বুঝতে পারলাম ভাষার আসল শক্তি কোথায়। এখন আর স্মৃতিতে সব জমিয়ে রেখে শাস্ত্রে ঢুকিয়ে রাখার দরকার নেই, সরাসরি কোনো ঘটনা ঘটার সময়টাকেই হুবহু বর্ণনা করা সম্ভব হলো।

এর বহু বছর পর এলেন রত্নাকর ডাকাত। একদিন তিনি পাপের জালে জড়িয়ে পড়লেন, আর নারদ তাকে উপদেশ দিলেন রামের আরাধনা করতে। কালক্রমে সেই রত্নাকরই হয়ে উঠলেন মহর্ষি বাল্মীকি, আর তার সঙ্গে তীর্থে ঘুরতে লাগলেন শিষ্য ভরদ্বাজ। ইতোমধ্যে নারদ এসে তাদের রামের জীবনকথা শুনিয়ে গেছেন। তবে তখনও তা কেবলই জীবনকথা—নারদ বীণা বাজান, থামেন, তারপর জীবনকথা শোনান; আবার থামেন, কিছুক্ষণ বীণা বাজান।

ইতোমধ্যে বাল্মীকির মনে রামের আকুলতা বা ঘোরের সৃষ্টি হলো। ভরদ্বাজকে সঙ্গে নিয়ে তিনি জাহ্নবীর কাছে তমসা নদীর ধারে ঘুরছেন। চারপাশের সেই স্বচ্ছ জল দেখে মুগ্ধ হয়ে বাল্মীকি বললেন, “অকর্দমমিদং তীর্থং ভরদ্বাজ নিশাময়...”—ভরদ্বাজ, এই নদীর জলের কী চমৎকার স্বচ্ছতা! ঠিক যেন চরিত্রবান মানুষের মনের মতো পরিষ্কার। বৎস, তুমি কলসিটা রেখে আমায় বল্কলটা দাও তো, আমি একটু স্নান করি। এটি পূর্ণ ছন্দে বলা হলেও তখনও তা শ্লোকের মর্যাদা পায়নি।

সেই বল্কল হাতে নিয়ে জলে না নেমে বাল্মীকি বনের এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। পাখি ডাকছে, নদী বয়ে চলেছে কুলকুল শব্দে। রামের কথাগুলো তার মাথার মধ্যে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে। কিন্তু কী যেন একটা নেই! কোথায় যেন একটা বড় শূন্যতা। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দেখলেন, গাছের ডালে এক জোড়া ক্রৌঞ্চ বা বক মিথুন খেলায় মত্ত। বাল্মীকি তাদের নাম দিলেন ‘কলকণ্ঠ ক্রৌঞ্চ’। এই ‘কলকণ্ঠ’ শব্দটি বাল্মীকিরই সৃষ্টি, অপূর্ব এক শব্দ! যেখান থেকে একটা পাখির গলা থেকেই অনেকগুলো পাখির সুরেলা কলকাকলি ঝরে পড়ে।

ঠিক সেই মুহূর্তে এক ব্যাধ এসে তার চিরচেনা কাজটিই করল, ছুঁড়ল তির। তিরের আঘাতে বিদ্ধ হয়ে পুরুষ বকটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল রক্তাক্ত হয়ে। আর তার সঙ্গী ক্রৌঞ্চীটি নিচে না নেমে আকাশে উড়তে উড়তে সেই সহচরের জন্য আকুল কণ্ঠে কাঁদতে লাগল। একটু আগেই যারা ডানা মেলে প্রেমের আনন্দে মেতেছিল, তাদের এই পরিণতি দেখে বাল্মীকি যা বললেন, তাও ছন্দে গাঁথা। কিন্তু সেটিও ছিল ওই মহাভারতের মতো নিছক কোনো ঘটনারই বিবরণ।

আর ঠিক তার পরেই এলো সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ঘটনা তো ফুরিয়ে গেছে, কিন্তু তার গভীরে জমে থাকা তীব্র অনুভূতি থেকে জন্ম নিল এক আশ্চর্য উচ্চারণ: “মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগম শাশ্বতী সমাঃ। যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম।” এর মানে তো সবারই জানা—ওরে নিষাদ, তুই জীবনে কখনও প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারবি না, কারণ তুই কামমোহিত অবস্থায় ক্রৌঞ্চমিথুনের একটিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিস! আর এভাবেই জন্ম হলো কবিতার।

এরকম চরণ তো বাল্মীকি আগেও লিখেছেন, তবে এবারের এটার বিশেষত্ব কী? নিজেই তিনি ভরদ্বাজকে বোঝাচ্ছেন, শোকের চোটে তার বুক থেকে নারদের বীণার সুর থামিয়ে না দিয়ে সরাসরি গাওয়ার উপযোগী যে সমান অক্ষরের চরণ বা পঙক্তি বেরিয়ে এল, শোকের কোল থেকে জন্ম নেওয়ার কারণে এটি ‘শ্লোক’ নামে পরিচিত হবে।

তারপর একের পর এক ঘটতে লাগল অদ্ভুত সব কাণ্ড। ব্রহ্মা এলেন বাল্মীকির কাছে। বাল্মীকি তখন নিজের সেই নতুন সৃষ্টিতেই আচ্ছন্ন। ব্রহ্মা তাকে বসতে বললেন, আর বাল্মীকি আনমনে আবার বলে উঠলেন, “মা নিষাদ...”। তারপরের ছোট্ট একটা বিষয় শুধু রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কারও চোখে পড়েনি। বাল্মীকি ব্রহ্মাকে বললেন, রামের জীবনের কথা তো আমি নারদের মুখে টুকরো টুকরো শুনেছি, সবটা তো জানি না—রাক্ষস, সীতা, রাবণের গল্প জানি, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তো আমার জানা নেই!

উত্তরে ব্রহ্মা তাকে এমন এক অমর আশীর্বাদ দিলেন, যা আজও সাহিত্যের মানুষ, কবিতার মানুষ বুকভরে বয়ে বেড়ায়। ব্রহ্মা বললেন, “বাল্মীকি, আমার বরদান রইল, তোমার কাছে কিচ্ছু অজানা থাকবে না, সবই তোমার নখদর্পণে চলে আসবে। আর এই শ্লোকবদ্ধ মহাকাব্যের একটা কথাও কখনো মিথ্যে হবে না; যতদিন পৃথিবী থাকবে, ততদিন এই মহাকাব্য বেঁচে থাকবে।”

শুনে মনে হতে পারে দারুণ এক বর! কিন্তু আদতে প্রজাপতি তাকে কঠিন এক দায়িত্বের ঘানি টানতে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। অজানা সব বিষয় তিনি লিখবেন, অথচ তা এক ফোঁটাও মিথ্যে বা অনৃত হবে না। সেটা কী করে সম্ভব? তখন বাল্মীকি গভীরে ধ্যানে বসলেন এবং মানুষের মনের দ্বিতীয় এক চিরন্তন জিনিস আবিষ্কার করলেন। তিনি চোখের সামনে দেখলেন পুরো রামায়ণ যেন হাতের তালুতে রাখা একটা ছোট্ট আমলকীর মতো স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠেছে! কী অপূর্ব সেই উপমা! এটা আর কিছু নয়, এটাই হলো ‘কল্পনা’র জন্ম। যা মিথ্যে নয়, কিন্তু যা বর্ণনার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় অথচ সাধারণ মানুষের অজানা, সেটাই হলো ‘কল্পনা’। আর এই কল্পনার জাদুটাই বাল্মীকিকে রামায়ণের ভেতর টেনে এনে দাঁড় করিয়ে দিল খোদ একটি চরিত্র হিসেবে।

রবীন্দ্রনাথ এই পুরো ব্যাপারটির অন্তর্নিহিত রহস্য খুঁজে পেয়েছিলেন। তার ‘ভাষা ও ছন্দে’ কবিতায় তিনি লিখেছেন: “জানি আমি, জানি তাঁরে, শুনেছি তাঁহার কীর্তিকথা... নারদ কহিলা হাসি—‘সেই সত্য, যা রচিবে তুমি, ঘটে যা, তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি, রামের জন্মস্থান অযোধ্যার চেয়েও সত্য জেনো’।”

এখানে রবীন্দ্রনাথ নাটকের খাতিরে ব্রহ্মার জায়গায় নারদকে বসিয়েছেন, কারণ তিনি আরও পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, কল্পনা হয়তো আপাতদৃষ্টিতে বাস্তব নয়, কিন্তু কবিতার জন্য তার গুরুত্ব কতটা অপরিসীম। আর তাই তো জীবনানন্দ দাশ ‘কবিতার কথা’য় লিখেছিলেন, “সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি: কবি—কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা রয়েছে...।”

রবীন্দ্রনাথ তার ছড়া, পদ্য ও কবিতার তফাৎটাও বুঝিয়ে গেছেন। যেমন, ছড়ার বেলায় তিনি লিখেছেন: “ভোলানাথ লিখেছিল, তিন-চারে নব্বই—গণিতের মার্কায় কাটা গেল সর্বই...” (ভোলানাথ)। আবার পদ্যের বেলা পাই চিরায়ত এক গ্রামের ছবি: “আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে...” (আমাদের ছোট নদী)। এখানে কবির কলমের টানে কেবল চোখের সামনে একটা নিখুঁত দৃশ্য ফুটে ওঠে, যেখানে বাড়তি কোনো গভীর চিন্তার অবকাশ নেই।

কিন্তু যখন তিনি ‘কবিতা কী’ তা বোঝাতে চান, তখন তিনি আমাদের অন্য এক মায়াবী জগতে নিয়ে যান: “তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে। মনে সাধ, কালো মেঘ ফুঁড়ে যায় একেবারে উড়ে যায়...” (তালগাছ)। একটা অবুঝ তালগাছের মনের ভেতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ফুটিয়ে তুললেন চিরায়ত এক শিশুর না-বলা ইচ্ছেটাকে। এটাই হলো কবিতা, যেখানে তথ্যের চেয়ে কবির কল্পনাটাই আসল।

সংক্ষেপে বলতে গেলে: ছড়া হলো ধ্বনি, তাল আর খেলাচ্ছলে মুখস্থ করার জিনিস। পদ্য হলো ছন্দবদ্ধ ভাষায় কোনো দৃশ্য বা ঘটনার শিল্পিত রূপ, যার অর্থ একদম সরাসরি বোঝা যায়। আর কবিতা হলো ভাষার সাধারণ সীমানা ছাড়িয়ে প্রতীক, চিত্রকল্প ও গভীর অনুভূতির এক বহুমাত্রিক সৃষ্টি।

তাহলে কবিতা আর গদ্যের এই ফারাকটা আমরা কীভাবে টের পাই? এর উত্তর লুকিয়ে আছে এদের জন্মরহস্যের মাঝে। গদ্যের জন্ম হয়েছিল কোনো ঘটনাকে ঠিকঠাক ধরে রাখার জন্য। তাই গদ্যের ডিএনএ-তে থাকে ‘এলিমেন্ট অফ ট্রুথ’ বা সত্য ও ঘটনার উপাদান। পক্ষান্তরে কবিতার জন্ম কল্পনাকে ধারণ করার জন্য, যার ডিএনএ-তে রয়েছে ‘এলিমেন্ট অফ ইমাজিনেশন’ বা কল্পনার উপাদান। আদি যুগে হয়তো এই দুইয়ের সীমারেখা কিছুটা কাছাকাছি ছিল, সময়ের স্রোতে তারা একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে, কিন্তু তাদের ভেতরের মূল ডিএনএ বদলায়নি।

যেখানে ঘটনার সত্যতা থাকে, সেখানে ফিকশন বা অবিশ্বাসের জায়গাও থাকে। গদ্য পড়তে গেলে অজান্তেই আমাদের মনে পক্ষ-বিপক্ষ, সত্য-মিথ্যে ও বিশ্বাসের লড়াই শুরু হয়ে যায়। কিন্তু কবিতার মূল ভিত্তি যেহেতু কল্পনা, তাই সেখানে গতানুগতিক অর্থে মিথ্যে বা সত্যি বিচার করার সুযোগ থাকে না; তা হয়ে ওঠে কল্পনার খোরাক। সে কারণেই কবিতা পড়ার সময় আমাদের মনে সেই সত্য-মিথ্যার চিরাচরিত দ্বন্দ্ব কাজ করে না।

আমাদের পূর্বসূরিরা অনেক দূরদর্শী ছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন কবিতার এই সত্য-মিথ্যার সীমানা পেরিয়ে অলৌকিক এক ভুবনে বিচরণ করার ক্ষমতা রয়েছে। তাই তারা একে বাঁধতে চেয়েছেন নানা কড়া নিয়মে—ছন্দ, পদ আর চরণের বেড়াজালে তুলেছেন শক্ত পাঁচিল।

ভাষার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, কথন, গান আর লেখার মূলে রয়েছে কেবল ‘ধ্বনি’। প্রায় আশি লক্ষ বছর আগে ধ্বনির মাধ্যমেই মানুষের যোগাযোগের পথচলা শুরু হয়েছিল। আদি মানুষেরা যদি ইশারা-ইঙ্গিত ছাড়িয়ে ‘সাউন্ড’ বা শব্দ আবিষ্কার না করত, তবে গান বা কবিতার জন্মই হতো না। সুর তো অনেক আগেই এসেছিল, কিন্তু কথা বা লিপি এসেছে আরও অনেক পরে। ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের বেদ মূলত ছিল শ্রুতির্নির্ভর। বৈদিক গদ্যগুলোর নাম ছিল ‘ব্রাহ্মণ’ এবং পদ্যগুলোর নাম ‘ঋক’। সে থেকেই বোঝা যায়, গান আর কবিতার হাত ধরে ভাষার প্রথম নিয়মতান্ত্রিক রূপটি তৈরি হয়েছিল।

এবার যদি ইতিহাসের পাতায় একটু পেছনের দিকে তাকাই, তবে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো লিখিত কবিতা ‘এপিক অফ গিলগামেশ’-এর দেখা পাই। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে চর্যাপদের গানগুলো হলো আমাদের কাব্যধারার প্রথম রূপ। যদিও সিদ্ধাচার্যরা মূলত তত্ত্বকথা লুকাতে গিয়ে ছন্দের প্রতি খুব একটা নজর দেননি, তবুও সেখান থেকে জন্ম নিয়েছে বাংলা কবিতার নতুন এক ধারা। সাহিত্য কখনো এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে না; যুগের পর যুগ মানুষ গণ্ডি ভেঙে নতুন নতুন চিন্তার জন্ম দিয়েছে।

অধুনান্তিক বা আধুনিকোত্তর দৃষ্টিতে দেখলে গদ্য, কবিতা ও গানকে আলাদা কোনো খোপে না ফেলে ভাষার তিনটি ভিন্ন কাজ হিসেবে দেখা উচিত। আদিযুগে এদের মধ্যে কোনো শক্ত দেওয়াল ছিল না। গান হলো স্মৃতির ভাষা, যা সুরের জাদুতে স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে। গদ্য হলো ঘটনার ভাষা, যা বাস্তবের সঙ্গে আমাদের সংযোগ ঘটায়। আর কবিতা হলো কল্পনার ভাষা, যা ঘটনার গভীরে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য অর্থ খুঁজে ফেরে।

আজকের এই ডিজিটাল যুগে এসে এই পুরনো বিভাজনগুলো আরও ঝাপসা হয়ে গেছে। ফেইসবুকে বা বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে করা একটা ছোট পোস্টে হয়তো গদ্যের তথ্য, কবিতার মেজাজ আর গানের সুর একসঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ভাষা আজ আর কোনো নির্দিষ্ট খাঁচায় বন্দি নেই; সে এক রূপ থেকে অনায়াসে অন্য রূপে গলে যাচ্ছে।

ভাষা যতদিন টিকে থাকবে, মানবচেতনার এই ত্রিভুজও ততদিন নতুন নতুন রূপ ধারণ করে নিজেকে গড়ে তুলবে। সংক্ষেপে বলা যায়—গদ্য হলো ঘটনার শক্তি, গান হলো স্মৃতির শক্তি, আর কবিতা হলো কল্পনার শক্তি। মানবজাতির ভাষার ইতিহাস মূলত এই তিন শক্তির দ্বন্দ্ব, মিলন এবং অবিরাম আদান-প্রদানেরই মহাকাব্য।

তথ্যসূত্র:

১. বাল্মীকি, রামায়ণ, বালকাণ্ড, সর্গ ১–৩। ২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভাষা ও ছন্দ, রবীন্দ্র-রচনাবলী। ৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ভোলানাথ’, ‘আমাদের ছোট নদী’ ও ‘তালগাছ’, সঞ্চয়িতা। ৪. জীবনানন্দ দাশ, কবিতার কথা। ৫. অ্যারিস্টটল, পোয়েটিক্স। ৬. রোমান জ্যাকবসন, লিংগুইস্টিক্স অ্যান্ড পোয়েটিক্স, থমাস এ. সেবিওক সম্পাদিত ‘স্টাইল ইন ল্যাংগুয়েজ’, এমআইটি প্রেস, ১৯৬০। ৭. এম. এইচ. আব্রামস, দ্য মিরর অ্যান্ড দ্য ল্যাম্প: রোমান্টিক থিওরি অ্যান্ড দ্য ক্রিটিক্যাল ট্র্যাডিশন, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৫৩। ৮. সাইমন ব্রডবেক, মহাভারত, অক্সফোর্ড বিবলিওগ্রাফিস ইন হিন্দুইজম, ২০১১। ৯. এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, আর্লি বৈদিক পিরিয়ড। ১০. বাংলাপিডিয়া, চর্যাপদ। ১১. বাংলাপিডিয়া, বাংলা প্রোজ। ১২. স্মিথসোশিয়ান ইনস্টিটিউশন, হিউম্যান অরিজিনস প্রোগ্রাম, ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড সিম্বলস। ১৩. ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেস। দ্য এপিক অব গিলগামেশ, ৩০ এপ্রিল ২০২০।

ধরন ও বিষয়:
  • কবিতা
  • মেষপালক
  • পদ্য
  • গদ্য
  • বাল্মীকি
  • উপনিষদ
  • বেদ
  • মহাভারত
  • রামায়ণ
  • শ্লোক
  • ভাষার ইতিহাস
  • বৈদিক
  • চর্যাপদ
  • সাহিত্য
  • কাব্য
  • বাংলা সাহিত্য

লেখাটি কেমন লাগল?

  • ০টি ভালোবাসা
  • এখনও কোনো রেটিং নেই

আলী আফজাল খান

লেখক

আলী আফজাল খান

কবি ও প্রাবন্ধিক

জন্ম ৩০ জুলাই, ১৯৭৮। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক এবং এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পাদন করে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে তিনি প্রকাশনা ব্যবসায় যুক্ত হন। বর্তমানে প্রকাশনা সংস্থা ‘ভিন্নচোখ’-এর স্বত্বাধিকারী এবং সাহিত্য লিটলম্যাগ ‘ভিন্নচোখ’ ও বই বিষয়ক পত্রিকা ‘পোস্টমর্টেম’-এর সম্পাদক ও প্রকাশক। তার প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কবিতাবইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘রাধা আমার দ্রৌপদী আমার’, ‘এন্টিম্যাটার’, ‘তরজা-পালাকবিতা’, ‘অণু ভবের জার্নাল’, ‘কালাচাঁন’ এবং বাংলা-ইংরেজি-স্প্যানিশ ত্রিভাষিক কবিতাবই ‘ডিম্পলস অব ভেনাস’। প্রবন্ধবইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘ভাষার হাঁড়ি’ এবং ‘পাঠ ও পাঠক: ভাষা, দর্শন ও কবিতা’।

মন্তব্য

মন্তব্য লোড হচ্ছে…