নদী জানে
‘নদী ও নারী’, হুমায়ুন কবিরের উপন্যাসটি কখনো পড়া হয়নি আনিকার। তবে নদীর সঙ্গে নারীর গভীর একটা যোগসূত্র রয়েছে বুঝতে পারে সে।
৭ মিনিটে পড়া

ও বাবা গো! আমারে কই আইনা ফাললা গো! নদীর ওই পাড় থেকে ভেসে আসা কান্নার শব্দে থমকে যায় আনিকা। মৌফুলের কান্না ভেসে আসছে। বেচারির পেটের ক্ষুধা যখন তীব্র হয় তখন নদীর পাড়ে বসে এভাবেই গলা ফাটিয়ে কান্না করে। যেন তার কান্নার শব্দ স্রোতের টানে ভেসে চলে যাবে তার বাবার কাছে। আর তার বাবা খাবার নিয়ে এসে তাকে বলবে, “আর কাঁদিস না মা। এই নে, তোর জন্য মুলার ছালুন দিয়া গরম ভাত আনছি। খাইয়া নে।”
কিন্তু তা হয় না। মৌফুলের বাবা আসে না। ছেলে-মেয়েরাও মলিন মুখে কিছুক্ষণ মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে চলে যায়। প্রতিবেশীরা যার যার কাজে ব্যস্ত। মৌফুল এখন আর ছোট্টটি নেই। তিন সন্তানের জননী। পেটের ক্ষুধায় তার এভাবে কান্না করা মানায় না। এমনটা ভেবেই কেউ সান্ত্বনা দিতেও এগিয়ে আসে না মৌফুলকে। তাই নদীর জলে নিজের চোখের জল ফেলে একা একাই নিজেকে হালকা করে নেয় মৌফুল।
অভাবের সংসার। স্বামীর আয় কম। তিন বাচ্চা আর এক বৃদ্ধ শ্বশুরকে নিয়ে কোনো রকম দিন চলে মৌফুলের। তবু অন্যের বাড়িতে কাজ করার অনুমতি নেই তার। তার স্বামী অত্যন্ত ভালোবাসে তাকে। কারো ঘরের দুয়ারে কাজের জন্য বা খাবারের জন্য যেতে দেয় না কখনো।
কিন্তু স্বামীর একা উপার্জনের টাকায় সংসার চলে না। প্রায় দিন আধপেটে থাকতে হয় তাদের। কোনো কোনো দিন পুরোপুরি উপোস। মহিলাটা ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে পারে না। তাই যেদিন পেটে একদমই কোনো ভাত পড়ে না, সেদিন নদীর পাড়ে বসে এভাবে কান্না করে।
নদীর পাড়ে একা বসে এতক্ষণ মৌফুলের কান্না শুনছিল আনিকা। আনিকারও মন খারাপ। সেও মন খারাপ হলে চলে আসে নদীর পাড়ে। তার মন খারাপের কথাগুলো বলে নদীকে। ‘নদী ও নারী’, হুমায়ুন কবিরের উপন্যাসটি কখনো পড়া হয়নি আনিকার। তবে নদীর সঙ্গে নারীর গভীর একটা যোগসূত্র রয়েছে বুঝতে পারে সে। নারী যেমন না বলা অনেক কষ্ট লুকিয়ে রাখে নিজের ভেতর। তেমনি নদীও রাখে।
চৈত্রের প্রখর রোদে নদীর গতি সঞ্চালনকারী প্রাণরস যখন শুকিয়ে যায়, নদীর বুকে চর জাগে তখন তার খুব কষ্ট হয়। কিন্তু কাউকে কষ্টগুলো বলতে পারে না। বিষবাষ্প হয়ে বাতাসে ভেসে বেড়ায় সে কষ্ট! খুব নীরবে!
টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার আতা-উল্লা ও ফলদা এই দুই গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে ঝিনাই নদী। এই নদীটির সঙ্গে জন্মের পর থেকে আনিকার পরিচয়। তার সুখ দুঃখের সঞ্চিত ব্যাংকও বলা যায় এই নদীকে। কোনো বিষয়ে কষ্ট পেলেই নদীর কাছে ছুটে আসে আনিকা। নীরবে অশ্রু ঝরায়। জলের বুকে জল ফেলে হালকা করে নেয় নিজেকে! তবু মানুষ নামের বন্ধুর কাছে যায় না কখনো। ভয়ে! কেননা বিশ্বাসঘাতকতার মতো জঘন্যতম কাজগুলো মানুষই করে! কিন্তু নদী তা কখনোই করে না!
নদীর ওই পাড়ে ঝাঁকিজাল ফেলে মাছ ধরছে ‘বিদেশি’, মৌফুলের স্বামী। নিজ বিভাগের বাইরে চট্টগ্রাম বিভাগে জন্ম হয়েছে বলে বাবা-মা আদর করে নাম রেখেছেন ‘বিদেশি’। টাকা-পয়সায় বা পেশার জন্য তাকে এ নামে ডাকা হয় না। মূলত খুবই হতদরিদ্র লোক সে। পেশায় একজন জেলে। মাছ ধরা ছাড়া আর কোনো কাজ সে ভালো পারেও না।
বিদেশি সারারাত নদীতে মাছ ধরে দিনের বেলা তা বিক্রি করে তিন সন্তান আর বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে কোনো রকমে দিন পার করে। বিদেশির বৌ মৌফুল। অত্যন্ত সরল স্বভাবের একজন নারী। খাওয়া পড়ার বাইরে সে কোনো হিসাব বোঝে না। আয় শব্দটা তার কাছে খুবই অপরিচিত। কয়দিন যাবৎ ভালো মাছ ধরতে পারছে না বিদেশি। আর তাই চুলাও জ্বলছে না ঠিকঠাক মতো। এজন্য বউটা ওমন করে কাঁদছে। আজ বিদেশি দিনের বেলায় জাল নিয়ে বের হয়েছে।
নদী বড়ই অদ্ভুত। এই নদীর পানির গভীরে কত মানুষের আহার লুকায়িত আছে। কত মানুষের মুখে হাসি ফোটায় এই নদী। আবার এই নদীর জল ধরে যখন অজ্ঞাত লাশ ভেসে আসে, তখন এই নদীই হয় পরিবারগুলোর কান্নার কারণ। আনিকার মনে পড়ে যায় গত চৈত্রে লিমা নামের ছয় বছরের এক ছোট্ট মেয়ের কথা।
দুপুরবেলা হাতে লাল প্যান্ট আর একটা গামছা নিয়ে বান্ধবীদের সঙ্গে গোসল করতে এসেছিল সে। শরীরে সাবান মেখে ডুব দিতে গিয়ে অল্প পানিতেই কীভাবে যেন ডুবে মারা গেল মেয়েটা! ডাঙায় পড়ে রইলো লিমার লাল প্যান্ট আর গামছা। আনিকা, রিনা, ফাতেমা ওরা তিন বান্ধবীও পাশে গোসল করছিল সেদিন। একটু দূরে শ্রমিকরা শুকিয়ে যাওয়া নদী থেকে মাটি কেটে নিচ্ছিল। আনিকা পানিতে চুল ভাসতেও দেখেছিল। কিন্তু সেটা যে লিমার মাথার চুল বুঝতে পারেনি।
তারা ভূত ভেবে চলে গিয়েছিল পাশের ঘাটে। মুহূর্তেই লিমার মা দলবল নিয়ে কান্না করতে করতে আসে নদীর পাড়ে। পানিতে নেমে খুঁজতে থাকে লিমাকে। অনেকক্ষণ খোঁজার পর মাঝ নদীতে ডুবিয়ে রাখা এক নৌকার নিচ থেকে লিমাকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে সে মৃত। লবণ মেখে নাড়াচাড়া করে কতভাবে চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাঁচানো যায় না লিমাকে। কত কান্না। আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে লিমার মায়ের কত আহাজারি! বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে লিমা। আহারে! নদী তাকে কেড়ে নিল! বাবা মায়ের কোল খালি করে দিল!
লিমার কথা ভাবতে ভাবতে আনিকা খেয়াল করলো মৌফুল আর কাঁদছে না। তার কান্না থেমে গেছে। আর বিদেশিকে ঘিরে রেখেছে তার তিন সন্তান- হীরা, মানিক আর মুক্তা। কী বাহারি নাম ছেলে-মেয়েগুলোর! ঘরে খাবার না থাকলে কী হবে, নাম রেখেছে সব মহা মূল্যবান বস্তুর সঙ্গে মিল রেখে।
মৌফুল তার সাদা উঁচু দাঁতগুলো বের করে হাসছে। হীরা, মানিক আর মুক্তা খুশিতে লাফাচ্ছে। তাদের মায়ের হাতে ৬-৭ কেজি ওজনের এক বাঘাইড় মাছ। সোনালি আর কালো রঙের ডোরাকাটা শরীর। কম করে হলেও মাছটা হাজার থেকে বারোশত টাকা বিক্রি করা যাবে। আর তা দিয়ে চাল-ডাল এনে পেট ভরে খেতে পারবে তারা। বিদেশি পানি থেকে উঠে হাত-পা মুছে নিল। শরীরে একটু সরিষার তেল লাগিয়ে রওনা দিল আলমনগর হাঁটের দিকে। সঙ্গে দুই ছেলে। খালি গা, ছেঁড়া আর কুঁচকে যাওয়া প্যান্ট পরনে। তবে তাদের চোখেমুখে আনন্দ, মহা আনন্দ!
আনিকা পুরো দৃশ্য দেখে ভাবতে লাগলো নদীর জলের অন্তহীন রহস্যের কথা। মৌফুলের মুখে নির্মল হাসি ফুটানোর কথা, বাচ্চাদের আনন্দের কথা। আবার লিমার মায়ের সেই বুকফাটা আর্তনাদের কথা। আনিকার ভাবনার আড়াল হলো না তার চাচাতো বোন সন্ধ্যার কথাও, যে ছিল অত্যন্ত সুন্দরী। আর মেয়েটার সৌন্দর্যই ছিল তার আজন্ম পাপ! তার শরীর নিয়ে সময়ে সময়ে স্বামীর বাজে কথা শুনতে হতো। আর কথাগুলো মেয়েটার অন্তরে ছুরির মতো বিধতো। ক্ষতবিক্ষত হতো তার সুস্থ চিন্তাগুলো। মস্তিষ্কের কোষগুলো অন্যায় না সইতে পেরে চিৎকার করে উঠতে চাইতো কখনো কখনো। কিন্তু পারতো না।
অবশেষে নদীর জলেই ডুবে মরেছিল সে। সংসারে নদীর মতো গভীর অশ্রু বুকে নিয়ে নীরবে বয়ে চলে অনেক মেয়েই। সহ্য করে যায় সবকিছু। এক সময় যখন সহ্যের বাঁধ ভেঙে যায় তখন শেষ চৈত্রের গান গেয়ে জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটায়। কেউ অন্ধ বিশ্বাসের খেসারত দেয়! কেউ ভুল মানুষের সঙ্গে সঠিক সুন্দর স্বপ্ন সাজিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখার মতো মস্ত ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করে! আবার কেউ কেউ মৌফুলের মতো চিৎকার করে কান্না করে খাবারের জন্য, “ও বাবা গো তুমি আমারে কই আইনা ফাললা গো!”
- গল্প
- মেষপালক
- মেষপালক সাহিত্য
- মেষপালক গল্প
- অণুগল্প
- দীর্ঘ গল্প
- নদী
- নারী
- নদী ও নারী
লেখাটি কেমন লাগল?
- ০টি ভালোবাসা
- এখনও কোনো রেটিং নেই



মন্তব্য
মন্তব্য লোড হচ্ছে…