মেষপালক
কবিতা

একদিন আমিও হতে পারি চঞ্চল গাছ

রাজিয়া সুলতানা নুরিনের এক থোকা কবিতা

রাজিয়া সুলতানা নুরিন

৩ মিনিটে পড়া

রাজিয়া সুলতানা নুরিনের এক থোকা কবিতা
ব্যবহৃত অলঙ্করণ: এডভার্ড মুঙ্ক (১৮৬৩ – ১৯৪৪), নরওয়েজীয় চিত্রশিল্পী।

১.

এখন আমি বুঝতে পারি না কোনটা আমি স্বপ্নে দেখি, কোনটা আমার বাস্তব। চেতন অবচেতনের এক বিস্ময়কর দৌড়ঝাঁপে আমি কেবল মাটির উপর এলায় থাকি। মনে হয় একদিন আমিও হতে পারি বটের মতো চঞ্চল গাছ, যার পাতারা আলাদা আলাদাই দোল খায় সারাদিন। আমার স্বপ্নের জীবন এতো দীর্ঘ। আমার কল্পনার সংকেত, আমার বেঁচে থাকার চিহ্ন, সব বিক্রি হয়ে গেছে করুণ দামে। কাল দেখলাম তুমি আমাকে আর চিনো না। তোমার নাম বদলে গেছে, আমার শরীর বদলে গেছে— আমরা দুজনে একটা গাছের মাঝামাঝি বসে জীবন ভাগাভাগি করতে করতে দেখলাম অঙ্ক মিলছে না। দুজন দুজনের গলা কেটে সে ভাগ মিলালাম। প্রচণ্ড আনন্দে ঘুম ভেঙে দেখলাম বাজারে অনেক ট্রাক বেরিয়েছে, অনেক শব্দ। বাজারে অনেক আম উঠেছে। তোমার শরীর-স্বাস্থ্যের খবর পেলাম না।

২.

আমি যে শহরে জন্মেছিলাম

সেই শহর হাঁটাপথেও আমি চিনি না,

শহর বলতে আমি বেড়িয়েছি কয়েকটি কেবল,

গ্রামের কিছু কিছু বন্ধুত্ব আমার ভেঙে গেল শহরে

এলাম বলে,

শহর বলতে ঢাকা,

আজ দশ বছর,

হাঁটা পথে ঢাকাও আমি চিনি না।

অথচ জীবন বোধ হয় অর্ধেক শেষ,

দেবতা আর মানুষ, আর মনোবিজ্ঞান

সব ছেড়ে সব জেনে সব বুঝে,

হেঁটে চলে যেতে ইচ্ছে করে বহুদূর জঙ্গল

একটা বাঘ থাকুক, দু’চারটে হায়েনা

পালবো না, সঙ্গ দিক

কথা না হোক, ওরা সব বুঝে নিক।

৩.

বলতে চেয়েছিলাম কেবল প্রেম আর জন্ম বিষাদের কথা, কিন্তু একদল লোক জোর করে কেবল রাগ আর মৃত্যুর কথা বলাচ্ছে।

৪.

ধরো, তুমি হাত না বোলালে ফুটবেই না কোনো সূর্যমুখী,

ধরো, তুমি চোখ না খুললে ডাকবেই না কোনো পাখি

বা রাত থেকে আর সকাল হলো না,

পান থেকে চুন খসা হলো না,

বাড়ি বাড়ি আর ঝগড়া হলো না,

তুমি গান ভালোবাসো নাই বলে

দুনিয়ায় বন্ধ হয়ে গেল সকল শব্দ

নদী, সমুদ্র, পাহাড়, গাছ, মাছ কেউই

কোনো শব্দ করলো না,

ধরো তুমি কেবল হাত তোলো নাই বলে

কৃষক লাঙল ধরে নাই, পশু মরে নাই

কাগজ হয় নাই, কলম হয় নাই,

বই লেখা হয় নাই।

ধরো কেবল তুমি বলো নাই বলে কেউ

আজকে ভাত খায় নাই।

ধরো, তোমার যা যা অপ্রয়োজনীয়

আর অসভ্যতা মনে লাগে,

সেইসব কিছুই আর দুনিয়াতে হয় নাই।

গান হয় নাই

প্রেম হয় নাই

অক্ষর ভুলে আঁকা হয় নাই,

বিয়ে হয় নাই

নতুন ফুল, নতুন বাচ্চা

আম্মা ডাকা হয় নাই,

আব্বা বোবা হইলেন, আর

ভাতও হয় নাই।

দুনিয়ায় নাই আর কোনো মিলন।

ধরো সব কিছুর সব,

সবকিছুই কেবল তোমার

ইশারার জন্যে থাইমা রইল।

পুরো দুনিয়া তোমার দিকে

তোমার অনুভূতির দিকে তাকাইয়া থাকল।

কবে তুমি তাদের হাসার অনুমতি

দিবা।

কবে একটু ভালোবাসার কাছে যাবা

নিজেরে একটু বুঝে নিবা—

যেন তুমিই দুনিয়ার সব

বা তুমিই দুনিয়া।

তোমার আদরের ভয়ে

একটা দুনিয়া সারাজীবন থরথর কাঁপতাছে।

৫.

ভুল ভাঙতে ভাঙতে শেষেও পড়ে থাকে কেবল একটাই ভুল। একটাই খুন বাকি সব খুনের কারণ।

এবং

কৃষ্ণচূড়ার বন থেকে দৌড়ে আসা কোনো ঘোড়াই আর একা ফিরে না।

ধরন ও বিষয়:
  • কবিতা

লেখাটি কেমন লাগল?

  • ০টি ভালোবাসা
  • এখনও কোনো রেটিং নেই

রাজিয়া সুলতানা নুরিন

লেখক

রাজিয়া সুলতানা নুরিন

কবি

মনোবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত বই ‘পৃথিবীতে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত ঈশ্বর’ (২০২৩) ও ‘প্রথম জন্মের দিকে দৌড়াচ্ছে একটা ঘোড়া’ (২০২৬)।

মন্তব্য

মন্তব্য লোড হচ্ছে…