মেষপালক
কবিতা

কখনো জন্ম নিয়ো না, ওরা তোমাকে তুলে নিয়ে যাবে

বেডশিটের ফুলগুলো নয় মাস ধরে তাজা। সেখানে সুবাস আর শয়ন মিলেমিশে থাকে। আমার মিলমিশ ভালো লাগে না।

ফরহাদ নাইয়া

৫ মিনিটে পড়া

কখনো জন্ম নিয়ো না, ওরা তোমাকে তুলে নিয়ে যাবে

চোর

কাকেই বা আমার কী বলার আছে

হাজার লোকের সাথে হয় কথা

কিছুই করি নাই চুরি

তাও লাগে চোর চোর

ফুটপাতে হাঁটি আর ভাবি

পেছন থেকে ধাক্কা দিবে

এক দ্রুতগামী জাহাজ

অথবা

পেছনে যে লোকটা

মনে হবে তার হাতে ছুরি

বাসে চড়লেই লাগে

পাশের যাত্রী পকেটমার

কাউকে বলি না আর

তাও গোপন একটা কথা

পরানে গহিন নিদ্রায়

আমি তার নিশ্বাস টের পাই

তারে পাই না

সে বড় হয়

বছর বছর

তার ওজনে

এখনো তালুর অগ্রভাগ ভারী

কাকে যে কী বলি

সবাই ঘুমিয়ে যায় তিনটার আগে

আমার সাথে জাগে একটি তারা

যার কোনো নাম নাই, আকাশে ঠিকানা নাই

তার পোড়া ছাই কল্পনা করি।

হৃদমাতা

তোমারে কেমনে কই

তুমি হইলা সেই বই

যার গন্ধ নিছি,

বাট পড়ি নাই

তোমার হাত ধরি নাই

ধরি নাই তোমার চুল

ভুল ধরে পড়ে গেছি জলে

তোমার চাহনির গ্যাঁড়াকলে।

লোকে বলে আমি অন্ধ

অথচ তুমি সেই বই

পড়ি নাই, ধরি নাই

মুখস্থ করেছি কেবল গন্ধ।

দরজা

আটকাইয়া আছি এইখানে

যে-ই ডাকে

সে দরজা খুলতে বলে চলে যায়

যেন আমি মায়ার দারোয়ান।

পরের বাড়ির দরজায় দিতেছি পাহারা

আমার কি হবে না নিজের ঘর

কেউ থাকবে আপন আর কেউ পর

আমার বিছানায় কেউ কি আইসা

ঘুমাবে না চ্যাগাইয়া

কিচেনে পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে

কারো তো বলা উচিত

তুমি একটা বুয়া রাখবা।

আমি বলব

বুয়া নয় আমি রাখতে চাই তোমারে।

মরিচের গুঁড়ার সাথে,

আদা বাটা আর কষানো মাংসের সাথে

তুমি থাকবা।

আর আমাদের সাথে থাকবে একটা কালো বিড়াল

যে ডাকবে না। পাত্তা দিবে না।

সারাদিন শুধু খাবে।

ঘুমাবে

আর হিট উঠলে লাগাবে।

আমি তো মায়ার দারোয়ান

তিনবেলা হিটে থাকি

তুমি দরজা খুলতে বলে চলে যাও

তোমারে লাগাতে পারি না

কেবল দরজা লাগাই।

বাংলাদেশ ২০২৫

বেডশিটের ফুলগুলো নয় মাস ধরে তাজা। সেখানে সুবাস আর শয়ন মিলেমিশে থাকে। আমার মিলমিশ ভালো লাগে না। আমি কিছুটা ঝগড়া করি বউয়ের লগে। বউ কিছুটা ঝগড়া করে তার পোষা বিলাইয়ের লগে। বিড়ালটার মিউ মিউ আমার সহ্য হয় না। সারাদিন খায় আর ঘুমায়। সারারাত পার্টনার খোঁজে। আমি কিংবা আমার বউ কাউকে খুঁজি না। আমাদের খোঁজে পাওনাদার। যারা দরদ ধার দিছে তারা দরজায় কড়া নাড়ে। যারা স্নেহ ধার দিছে সেইসব বুড়োরা সারাদিন ফোন করে। আর ঘরের পাশে এক মলিন ব্যবসায়ী নির্জনতার সুপারশপ খুলে বসেছে। বউ প্রতিদিন সেখানে শপিং করতে যায়। আমাদের ইদানীং রান্না করতে ভালো লাগে না। বউ আমাদের নাস্তার জন্য কিনে আনে নীল বিষণ্ন পাউরুটি আর দুপুরের কলিজা পোড়া বিরিয়ানি। রাতে আমরা ফাস্টিং করি। কিছুই খাইনা দুইজন দুইজনার কপালের দিকে চেয়ে থাকি। আমরা ঘুমাই না। কারণ আমাদের চোখ খোলা রাখতে হয় পুত্র সুদিনের জন্য। সুদিন পাশের বাসার ডিভোর্সি আপাকে নিয়ে পালিয়েছে। সুদিন আসে না। আসে তিনভাই ইনুস, ইহুদি, মুদি। তিনজন ভিক্ষুক একসাথে ভিক্ষা চায় আমাদের শান্তি, প্রেম আর স্বাধীনতা। বউ কোনটাই দিতে রাজি না। আমি শান্তি আর প্রেম দিয়া শুধু স্বাধীনতা রাইখা দেই। বউ আরেকটু উদার হইতে কয়, সে আমার পাঁজর খুলে স্বাধীনতা দিয়া দিতে কয়। আমি বাধা দেই, কিন্তু স্বাধীনতা দেই না। বউ আমার স্বাধীনতা নিয়া টানাটানি করে আমি দেই না। এই টানাটানি করতে করতে বউ আমারে ঘরের সামনের কুয়ার কাছে নিয়া গিয়া এক ঝটকায় স্বাধীনতারে কুয়ায় ফেলে দেয়। কুয়ার ভেতর নিজের স্বাধীনতারে পানি পানি লাগে। বউ সেই পানি দিয়া গোসল করে। অতিথিরা পা ধোয়। আব্বা আইসা ওজু করে যায়। মা সেই পানি পান কইরা কলিজা ঠান্ডা করে। এই বিবিধ কাজকর্মের ভেতর আমি ভুলে যাই আমার স্বাধীনতা বইলা কিছু ছিল। একদিন মাতাল হইয়া হাঁটতে হাঁটতে আমি সেই কুয়ায় পড়ে যাই। আমার স্বাধীনতা আমারে পাইয়া খুশি হয় আমিও। দুইজনে গলাগলি ধইরা সেই ফুলতোলা বেডশিটে শুয়ে পড়ি। ফুলতোলা বেডশিটের ফুলগুলা ততদিনে ঝরে গিয়ে বেডশিট সাদা হয়ে গেছিলো। আর খাটের চারপাশের সেই ঝইরা যাওয়া ফুলের গন্ধ বন্ধক রেখে আমার বউ কিনে এনেছিলো নির্জনতার সুপারশপের সব থেকে দামি গয়নাটা ইনসোমনিয়ার মালা।

ওরা তোমাকে তুলে নিয়ে যাবে

গান পয়েন্টে নয় গান গেয়েও মেরে ফেলতে পারে তোমারে। তোমারে মেরে ফেলতে পারে মুখে ভাত তুলে দিয়ে। তুমি মাসুদ কিংবা শাহাদত অথবা হতে পারো তফাজ্জল। ফলাফল একই। জব চলে যাবে মব যাবে না। তারা তোমাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পেটাবে। তোমার নিজেকে ঢাক মনে হবে। টাক করে দিবে তোমার মাথা। তোমারে কবর থেকে তুলে করবে বারবিকিউ। তুমি পালাতে পারবে না, লুকাতে পারবে না, মরতে পারবে না, ওরা ধরে ফেলবে তোমার মৃত্যুও। সুতরাং কখনো জন্ম নিয়ো না, মানুষ হইয়ো না, বৃক্ষ হইয়ো না, হইয়ো না একটা পাথরও, ওরা তোমাকে তুলে নিয়ে যাবে।

মহাগোল

এখানে জোনাকপথ, সারি সারি তারা গাছে আলোর পাখিরা রিভিউ করছে ঘুম। চোখের কপাট খুলে একটি পোষা বালিশ খেপিয়ে তুলছে রাত, যেন এক্ষুনি তাড়িয়ে দেবে নগরীর সকল ছদ্মবেশ। হৃৎপিণ্ড গুটিয়ে নিচ্ছে রক্ত, তার সমস্ত শামুকে সংখ্যাতত্ত্বের বিষ। হে আকাশলীনা, এবার নিজেই বাজো। বজ্রে বজ্রে ছিঁড়ে পড়ছে মেঘের চান্দিনা। বাতাসের ঝালর খুলে, স্মৃতিতে মেঘের পরাগ। এমন দিনে অনন্ত নক্ষত্র বিথীকায় আমার চোখ ভারী করছে আকাশের ওজন।

ধরন ও বিষয়:
  • কবিতা

লেখাটি কেমন লাগল?

  • ০টি ভালোবাসা
  • এখনও কোনো রেটিং নেই

ফরহাদ নাইয়া

লেখক

ফরহাদ নাইয়া

কবি

কবি। জন্ম ৩ ফাল্গুন, বরগুনার আমতলীতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত কবিতার বই: ‘মাছেরা শহরে আসায় মানুষেরা নদীর ভাব ধরল’, ‘হৃদমাতা’ ও ‘বাতাসের সওদাগর’। ‘হারপুন’ ও ‘রাষ্ট্র’ নামে দুটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন।

মন্তব্য

মন্তব্য লোড হচ্ছে…